সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ : ১৯

সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ৮:০০ অপরাহ্ণ |

সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা:  মানুষ : ১৯
প্রতিক ছবি

সাদিকুর রহমান পরাগ:বিভিন্ন সংবাদ ও গণ মাধ্যমে বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। এ সব ঘটনার কথা শুনে আমরা আঁতকে উঠি, শিউরে উঠি। আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। কোথায় যাচ্ছি আমরা? আমরা কি বিকারগ্রস্ত একটা সমাজে পরিণত হচ্ছি? হয়তো সমাজতত্ত্ববিদরা এর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। হয়তো রাজনৈতিক নেতৃত্ব এর থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারবেন। আমরা সেই আশায় রইলাম।
সাম্প্রতিক কালে কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে অতীতের অনেক কথাই মনে পড়লো। অনেকে হয়তো সেসব ঘটনা ভুলে গেছে। এখনকার প্রজন্ম অনেকেই হয়তো সেসব ঘটনার কথা জানে না। ২০০১ সালের অক্টোবর মাস জুড়ে এক নারকীয় তান্ডব ঘটে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। অনেকে কিশোরী, অনেক নারীই তখন গণধর্ষিত হয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে।
ভোলা জেলার লালমোহন থানার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের অন্নদা প্রসাদ গ্রামের ৫০ জন নারী একই দিনে, ভেন্ডারবাড়ি পুকুরপাড়ে মা ও শিশু, ঠাকুরগাঁও বামনপাড়া গ্রামে মালারানি ও পরীবালা গণধর্ষণের শিকার হয়।
দিনাজপুরের ধনগ্রামের মালা রানীকে শ্লীলতাহানি এবং গীতা রানীকে বিবস্ত্র করা হয়।
ফরিদপুরে ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর গ্রামে সংখ্যালঘু পরিবারের কলেজ পড়ুয়া কন্যাকে মায়ের রাত ১টা পর্যন্ত মায়ের সামনে ধর্ষণ করা হয়। এরপর তাকে বাড়ি থেকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে পুনরায় গণধর্ষণ করে ভোরবেলা আহত অবস্থায় বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যায়।
বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের রাজারচর গ্রামের পবিত্র মিস্ত্রির স্ত্রী, মেয়ে ও বোনকে গণধর্ষণ করে। গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের দুই ভাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুই গৃহবধূকে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করা হয়। একই উপজেলার আশককাঠিতে ২৩ বছরের এক গৃহবধূ, একজন স্কুল ছাত্রী, একজন শিক্ষকের মেয়ে, একই গ্রামের ২০ বছরের তরুণী, উত্তর চাদসী গ্রামের নববিবাহিত স্ত্রী, কাপালি গ্রামের ১৪/১৫ বছরের তিন কিশোরীকে গণধর্ষণ করা হয়। একই জেলার উজিরপুর থানার সাতলা গ্রামের এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
বাগেরহাটের কোড়ামারা গ্রামের নারায়ণ দাসের পুত্রবধূকে তার সামনেই ২০/২৫ জন গণধর্ষণ করে। মোল্লার হাট উপজেলার বড়গাওলা গ্রামের সুনীতি মালাকার এবং তার কন্যা টুলু সহ ৩ মহিলাকে ২০/২৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী অস্ত্রের মুখে গণধর্ষণ করে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ৭/৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। দৌলতপুরের গুড়ারপাড়া গ্রামের গৃহবধূ আনোয়ারা বেগমকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
যশোরের সার্শা থানার গাতিপাড়া গ্রামের দুই সন্তানের জননী আঞ্জুয়ারাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নহাটা গ্রামে দুই সংখ্যালঘু ছাত্রীকে সারারাত গণধর্ষণ করে একটি মাঠে ফেলে রেখে যায়।
কেরানীগেঞ্জের বেলনা গ্রামে ৫ জন তরুণী ও মহিলা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। এদের বয়স ১৪ থেকে ৪৮ বছরের মধ্যে।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাচুরিয়া গ্রামের স্টিফান মারান্দ্রির স্ত্রী ধর্ষিত হয়।
বরগুণার পাথরঘাটার হোগলাপাশা গ্রামের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়।
মুন্সীগঞ্জের পঞ্চশাল দশকানির বাসিন্দা নওয়াব আলীর তিন কন্যা গণধর্ষণের শিকার হয়।
বান্দরবান জেলা সদরের তমপ্রুপাড়ার মারমা তরুণীকে গণধর্ষণ করা হয়। কন্যার সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে পিতা ব্র মংউ গুলিবিদ্ধ হয়।

দেশজুড়ে সংঘঠিত এমনি অসংখ্য নারকীয় ঘটনার প্রেক্ষাপটে ২০০২ সালে ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামকে আহবায়ক করে গঠিত একটি নাগরিক কমিটির উদ্যোগে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ শীর্ষক একটি কনভেনশন হয়েছিল। সেই কনভেনশনেই উঠে এসেছিল এইসব ঘৃণ্য, ন্যক্কারজনক ও মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলো। এই কনভেনশনে কাজ করতে গিয়ে এইসব ঘটনা বিশদ জানার সুযোগ হয়েছিল আমার।

এরকম প্রায় সহস্র গণধর্ষণের ঘটনা সেদিন ঘটেছিল। কোনটির কথা বলবো? কার কথা বলবো? কয়জনের কথা বলবো?
তারপরও দুয়েকটি ঘটনার কথা না বললেই নয়।

কিছুদিনের জন্য আমার সহকর্মী ছিল পূর্ণিমা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার পূর্ব দেলুয়া গ্রামের পূর্ণিমা রাণী শীল। অনেকের হয়তো মনে আছে তার কথা। ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর রাতে ২৫/৩০ জনের একটি দল পূর্ণিমাদের বাড়িতে হামলা করে। তখন সে দশম শ্রেণীর ছাত্রী। নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে ঐ রাতে কিশোরী পূর্ণিমাকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়। মেয়েকে বাঁচাতে অসহায় মা একসময় বলে ওঠে, আমার মেয়েটা ছোট, তোমরা একজন একজন করে আসো…..। কতটা অসহায়ত্ব থেকে একজন মা-কে সেদিন এ-কথা বলতে হয়েছিল।
পরবর্তীতে সেই পূর্ণিমাই প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে সাহস নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সাফল্যের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে মাথা উঁচু করে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আজকে মালালা-কে নিয়ে মাতামাতি হয়। কিন্তু পূর্ণিমাকে কি আমরা মনে রেখেছি?
অভিনন্দন পূর্ণিমা।
মহিমার কথা কি মনে আছে আপনাদের? রাজশাহীর পুঠিয়ার মেয়ে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে মহিমা অনেক স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখা করতো। সেই মহিমাকে স্থানীয় জামাতি দুর্বৃত্তরা বাড়ির পাশের ক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং তার ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। লজ্জায় অপমানে মহিমা আত্মহত্যা করে। ঢাকা থেকে বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি প্রতিনিধি দল গিয়েছিল মহিমাদের বাড়িতে ভীত-সন্ত্রস্ত বাবা-মাকে সাহস যোগাতে। সেই দলের সঙ্গে যাবার সুযোগ আমারও হয়েছিল। জরাজীর্ণ বাড়িতে ঢোকারে আগে ডান দিক ধরে কিছুদূর গেলেই সেই জায়গাটি যেখানে জায়গাটি যেখানে নরপশুরা কিশোরী মহিমাকে ধর্ষণ করে। অসহায় বাবা-মাকে কিছু বলার মুখ আমাদের ছিল না। তারা তখন শংকিত মহিমার ছোট বোনটির নিরাপত্তা নিয়েও।
শেফালিকে কি কারো মনে পড়ে?
ভোলা জেলার লালমোহন থানার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের অন্নদা প্রসাদ গ্রামের শেফালি। ওই গ্রামের মানুষ কখনোই ভুলতে পারবে না ২০০১ সালের ২ অক্টোবরের বিভীষিকময় রাতটির কথা। প্রায় ৮/১০ টি দলে বিভক্ত শত শত নরপশু পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায় অন্নদাপ্রসাদ গ্রামে। অর্ধশতাধিক নারী সেই রাতে ধর্ষণের নির্মম শিকার হয়। এর মধ্যে ১০ বছরের শিশু থেকে ৬৫ বছরের বৃদ্ধা ছিল।
বাবরি মসজিদকে ঘিরে যে নারকীয় দাঙ্গা হয়েছিল, সেই দাঙ্গায় পা হারিয়েছিল শেফালি। সবাই যখন প্রাণভয়ে পালাচ্ছিল তখন ক্রাচে ভর দিয়ে পালাতে পারেনি শেফালি। ক্ষেতের আড়ালে আশ্রয় নেয় সে। সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায় পঙ্গু শেফালিকে। পাশবিক গণধর্ষণে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। নরপশুদের দাঁতের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত শেফালী ৪দিন অজ্ঞান অবস্থায় ছিল। সেই শেফালিকে যখন ঢাকায় সেই কনভেনশনে নিয়ে আসা তখন সঙ্গে ছিল তার ছোট্ট মেয়েটি। মেয়েটির বিহ্বল দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী, আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় শেফালিকে কৃত্রিম পা সংযোজন করে দেওয়া হয়।
কিন্তু যে ক্ষত শেফালির মনে গেঁথে আছে সেই ক্ষত মুছবে কি দিয়ে?
আপনাদের কি এর উত্তর জানা আছে?
আমার জানা নেই।

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com