ষড়যন্ত্রের শিকার মুসলিম জাতি : গত ২৫ বছর বিশ্বে সোয়া কোটি মুসলিম প্রাণ হারিয়েছে

সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ৭:৪০ অপরাহ্ণ |

ষড়যন্ত্রের শিকার মুসলিম জাতি : গত ২৫ বছর বিশ্বে সোয়া কোটি মুসলিম প্রাণ হারিয়েছে
ফাইল ছবি

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : সংঘাতপূর্ণ মুসলিম বিশ্বে গত ২৫ বছর সোয়া কোটি মুসলিম প্রাণ হারিয়েছে । গত শনিবার তুরস্কের গবেষক রেফিক তুরান ইস্তাম্বুলে এক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে এ তথ্য প্রকাশ করেন । তিনি বলেন, মানব ইতিহাসে লড়াই এবং যুদ্ধ এক অপরিহার্য অংশ । তুরস্কের ইতিহাস সমিতির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এ পন্ডিত বলেন, সচরাচর দুই দেশের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ হয়ে থাকে । এক্ষেত্রে একটা যুদ্ধের ফল কি হবে, তা নিয়ে ভবিষ্যতবানী করা কঠিন । কিন্তু যাই বলিনা কেন, যুদ্ধ আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে । ”বিশ্বযুদ্ধ, তুর্কি ও সিরিয়া ক্ষমতার এক অসমাপ্ত লড়াই শিরোনাম” উপলক্ষে উক্ত সম্মেলনে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক গবেষনায় দেখা গেছে, সংঘাতে মুসলমানদের বড় একটা অংশ ক্ষয় হয়ে গেছে । গত ২৫ বছরে প্রাণহানির সংখ্যাটা সোয়া কোটির কম নয় । মি. রেফিক তুরানের বক্তব্যে মুসলমানদের প্রাণহানির খতিয়ান এই প্রথম প্রকাশ পেয়েছে । তার বক্তব্য মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে । একটি সাহসী ও বস্তুনিষ্ট তথ্য প্রকাশের জন্য মি. রেফিক তুরান ইতিমধ্যে সর্ব মহলে প্রশংসিত ।

১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধ, ১৯৯২ সালে বসনীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে চলমান সিরিয়া গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন দেশে মুসলিমরা আকাতরে প্রাণ হারাচ্ছে । অমুক দেশে যুদ্ধ বন্ধ হলেও আগামীকাল অপর মুসলিম দেশকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে । উপসাগরীয় যুদ্ধ পরবর্তী আফগান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনে লাশের সারি বিশ্ব মানবতাকে কলঙ্কিত করেছে । ১৯৯১ থেকে ২০১৭ সাল পর্য্যন্ত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে সংগৃহীত খবরে জানা গেছে, উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে সিরিয়া গৃহযুদ্ধ পর্য্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কোটি মুসলিম শরনার্থীতে পরিনত হয়েছে । ২৫ বছরের যুদ্ধে কমপক্ষে এক কোটি আহত এবং ৪০লাখ বনি আদম সন্তান চীর দিনের জন্য নিখোঁজ হয়েছে । শরনার্থীদের একটি বিশাল অংশ পাকিস্তান, তুরস্ক, জর্ডান ও ইরানে আশ্রয় নিয়েছে । এছাড়া লাখ লাখ নরনারী এখনো পথেঘাটে, পাহাড় কিংবা বনজঙ্গলে অবস্থান করছে । গত পাঁচ বছর ২০ লাখ শরনার্থী সাগর কিংবা দূর্গম পথ পেরিয়ে ইউরোপ পাড়ি জমায় । অপরদিকে সাগরে ডুবে এবং পথে বিভিন্ন দূর্ঘটনায় প্রায় দেড় লক্ষাধিক শরনার্থী নিহত হয় ।

১৯৯১ সালে থেকে মিয়ানমারে কমপক্ষে অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা, ২৫ লক্ষাধিক বিতাড়িত এবং পঞ্চাশ হাজার নিখোঁজ হয়েছে । এরমধ্যে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে । অবশিষ্টরা সাগর কিংবা বনজঙ্গল পেরিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও সৌদী আরবসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয় । সূপ্রিয় পাঠক, বিগত ২৫ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে গৃহযুদ্ধ, রক্তপাত, হানাহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে মূলত: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ ইন্ধনে । ১৯৯১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইরাক আগ্রাসন শুরু করে । এরপর ১৯৯২ সালে বসনিয়া হার্জেগোবিনায় গণহত্যা চালায় কুখ্যাত সার্ব খ্রীষ্টান বাহিনী । মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইন্ধনে ঠান্ডা মাথায় কুখ্যাত সার্ব সেনা বসনীয় নীরিহ মুসলিম নরনারীর উপর হত্যাযজ্ঞ চালায় । সে সময় বৃটেনের গণধিকৃত প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দম্ভোক্তির সূরে বলেছেন, ”ইউরোপের মাটিতে কখনো মুসলিম দেশ মেনে নেয়া হবেনা” । তার এ বক্তব্যের তিনমাসের মধ্যে ৪৫ হাজার বসনীয় নরনারী শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ।

ইরাক ও বসনিয়া হার্জেগোবিনা ছাড়াও আফগানিস্থান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেন যুদ্ধেও ওয়াশিংটনের নগ্ন হস্তক্ষেপ শান্তিকামী বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে । মুসলিম বিশ্বের প্রতি শকুনের দৃষ্টি নিবন্ধ থাকার পাশাপাশি মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি করা হয়েছে । পরিস্থিতি এমনই হয়েছে যে, বর্তমানে এক মুসলিম দেশ অপর মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে আত্নঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে । এরমধ্যে আইএস জঙ্গীগোষ্ঠীর মাধ্যমে ওয়াশিংটন চূড়ান্ত খেলায় মেতেছিল । কিন্তু রাশিয়া, চীন ও কতিপয় মুসলিম দেশ মার্কিনীদের আসল রুপ উদঘাটন করে আইএস’কে নির্মূল করছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ও মার্কিন প্রত্যক্ষ মদদে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখন্ডে ইসরাইল নামক অবৈধ রাস্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় । আর তখন থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে সূ-গভীর যড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে । যার ধারাবাহিকতায় মুসলিম বিশ্বে সিরিজ আকারে যুদ্ধ বিগ্রহ ও রক্তপাত অব্যাহত রয়েছে । তবে এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জন্য স্ব:স্তিকর খবর হলো, ওয়াশিংটনের শক্ত প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে রাশিয়া ও চীনের উল্থান । আন্তর্জাতিক যে কোন ইস্যুতে এখন রাশিয়া ও চীন ওয়াশিংটনের শক্ত প্রতিদ্বন্ধী । সে হিসেবে ওয়াশিংটন ইচ্ছা করলেই আগামীতে যে কোন মুসলিম দেশে সামরিক আগ্রাসন কিংবা নগ্ন হস্তক্ষেপ করতে পারবেনা । এ সূযোগটি কাজে লাগিয়ে মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন ত্বরান্বিত হবে ।

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com