বিশ্ব রাজনীতিতে চালকের আসনে পুতিন

সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১:৩৪ পূর্বাহ্ণ |

বিশ্ব রাজনীতিতে চালকের আসনে  পুতিন

আনোয়ারুল হক আনোয়ার ঃ ইউক্রেন থেকে সিরিয়া অত:পর ইরান থেকে তুরস্ক সর্বত্র বিচরণ রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøামিদির পুতিনের। সিরিয়া গৃহযুদ্বে যখন বাসার আল আসাদের পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখন রুশ পদক্ষেপের মাধ্যমে আবারো আলোচনায় উঠে আসে বিশ্বের প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট ভøামিদির পুতিনের নাম। ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাদের টেক্কা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সূ-সংহত করতে সমর্থ হন। পারমানবিক ইস্যুতে ইরানের সাথে পশ্চিমা শক্তি কর্তৃক সৃষ্ট বিরোধে তেহরানের একনিষ্ট বন্ধু’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। শেষতক উভয় পক্ষকে এক টেবিলে এনে শান্তি চুক্তি সম্পাদনের ন্যায় জটিল ইস্যুর শন্তিপূর্ণভাবে সম্পাদনেও ভøামিদির পুতিন অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিন চীন সাগরের কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে চীনের বিরোধ অতপরঃ কোন কারন ছাড়াই আমেরিকার রণপ্রস্তুতি বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে। শেষতক কোন ঘোষনা ছাড়াই উত্তেজনা হ্রাসের নেপথ্যে কাজ করেছে ভøামিদির পুতিনের সমর্থন। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে নড়েচড়ে বসেছে ভøামিদির পুতিন। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে রাশিয়ার কুটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার হচ্ছে। যার সুবাদে রাজা বাদশা এমনকি তাদের প্রতিনিধিরাও মস্কো যাতায়ত বৃদ্বি করেছে। নিজ দেশে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল করতে সমর্থ হন পুতিন। পাশাপাশি সামরিক শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চোখ ধাঁধানো সাফল্যের নেপথ্যে পুতিনের নিরলস প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবী রাখে। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পশ্চিমাদের বিপরীতে কঠোর অবস্থান গ্রহনের মাধ্যমে রাতারাতি হিরো বনে যান পুতিন। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ভøামিদির পুতিন এখন চালকের আসনে অসীন।

পুতিনের পরিচিতি ঃ ১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর ভøামিদির পুতিন জন্মগ্রহন করেন। তিনি রুশ অর্থোডক্স গির্জার একজন সদস্য। এক সময় পুতিন কেজিবি প্রধান ছিলেন। রাশিয়ার অভ্যন্তরীন সংকটকালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের পদত্যাগের পর ভøামিদির পুতিন ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে রুশ প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব গহন করেন। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন। ২০০৪ সালে পুতিন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ৭ মে মেয়াদ শেষ হয়। এসময় সাংবিধানিক সীমাবদ্বতার কারনে তিনি ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না পারলেও ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার উত্তরসূরী হিসেবে বিস্বস্থ ও সাবেক সেনা প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ এর বিজয় সুনিশ্চিত করেন। পরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভøামিদির পুতিনকে মনোনীত করেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করে পুতিন তৃতীয় মেয়াদে এবং ২০১৮ সালে পূণরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

অভ্যন্তরীন অগ্রগতি ঃ তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহনের পর পশ্চিমা জগত এবং নিজ দেশের বিরোধীরা তাকে অ-গনতান্ত্রিক সরকার হিসেবে আখ্যায়িত করলেও দেশে আইনের শাসন প্রবর্তন এবং স্থিতিশীলতা আনয়নের মাধ্যমে রুশ সমাজ ব্যবস্থায় তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার সর্বশেষ জনপ্রিয়তা হচ্ছে ৮৪%। পুতিন তার শাসনামলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হন। রাশিয়ার অর্থনৈতিক ভিত এসময় শক্তিশালী হয়। দারিদ্রতা ৭০% হ্রাস পায়। মাসিক বেতন ৮০ ডলার থেকে ৭৯০ ডলারে উন্নীত করেন। জ্বালানী নীতি ঘোষনা করার ফলে দেশটি জ্বালানী খাতে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হয়। বৃহৎ জ্বালানী প্রকল্প হিসেবে দেশটি পারমানবিক শক্তিতে গনজাগরন সৃষ্টি হয়। অনেকগুলো রফতানী সহায়ক পাইপ লাইনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থার অবকাঠামো নির্মানে সফল হয় দেশটি। এরমধ্যে ইস্টার্ণ সাইবেরিয়া-প্যাসিফিক ওশেন অয়েল পাইপলাইন নর্ড স্ট্রিম প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুতিন লভ্যাংশের উপর কর হ্রাসসহ ১৩%হারে আয়কর ধার্য্যের বিষয়ে আইন পাশ করেন। এতে দেশটির রাজস্ব আয় বৃদ্বি পায়। ফলে অভ্যন্তরীন সমৃদ্বির পাশাপাশি লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থানের সূযোগ সৃষ্টি হয়।
সৌভিয়েত ইউনিয়নের সংকটকাল ঃ আফগানিস্থানে সৌভিয়েত বাহিনীর অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তি পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার যুবক পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। তখন সিআইএ এবং ওসামা বিন লাদেন গ্রæপের মাধ্যমে যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষন দেয়া হয়। পরবর্তীতে এসব যুবককে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে আফগানিস্থানে সৌভিয়েত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্বে যুদ্বে নিয়োজিত করা হয়। আফগান যুদ্বে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সন্মুর্খীন হলে একসময় আফগানিস্থান ত্যাগ করে সৌভিয়েত বাহিনী। একই সময় সৌভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে চরম আর্থিক মন্দা এবং দেশটির কয়েকটি অঞ্চল স্বাধীনতার দাবীতে মস্কো সরকারের ভিত দূর্বল করে দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় অদক্ষ এবং দূর্বল চিত্তের অধিকারী সৌভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গোর্বাচভ এদু’টি সংকট নিরসনে চরম ব্যর্থ হওয়ায় শেষতক সৌভিয়েত ইউনিয়নের কয়েকটি অঞ্চল স্বাধীনতা ঘোষনা করে। চরম আর্থিক মন্দা, পশ্চিমা ষড়যন্ত্র এবং সৌভিয়েত সা¤্রাজ্য ভেঙ্গে কয়েকটি দেশের অভূদ্যয়ের ঘটনাবলী সামাল দিতে না পেরে মিখাইল গোর্বাচভ এক পর্যায়ে ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হন। এরপর দেশটির হাল ধরেন বরিস ইয়েলৎসিন। অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত দূর্বল এবং মোটা বুদ্বির অধিকারী বরিস ইয়েৎসিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে দেশ ও জনগনের জন্য তেমন কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি উপরোন্ত তিনি পশ্চিমা শক্তিকে সমীহ করতেন। এতে করে বিশ্ব রাজনীতিতে রাশিয়ার গুরুত্ব হ্রাস পায়। এ সূযোগে আমেরিকা বিশ্বব্যাপী তাদের অবস্থান আরো সূ-সংহত করে তোলে। যার ফলশ্রতিতে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমারা তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে আগ্রাসন এমনকি সরকার পরিচালনায় দিক নির্দেশনা প্রদান করতে থাকে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভøামিদির পুতিন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। পুতিনের শাসনামল অর্থাৎ প্রায দুই দশকের ব্যবধানে রাশিয়া অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পে অগ্রগতি ঃ সিরিয়া যুদ্বে বাসার আল আসাদের আহবানে সাড়া দিয়ে রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থানরত যুদ্ব জাহাজ থেকে ৯৬০ মাইল দূরবর্তী সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অসংখ্য স্থাপনায় নিখুঁত ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় প্রতিপক্ষ আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের প্রতি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। এতদিন পশ্চিমা সমরবিদরা রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে পূরোপূরি সন্দিহান থাকলেও সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিদ্রোহীদের অবস্থানে ক্ষেপনাস্ত্র হামলার মাধ্যমে রুশ শক্তি সামর্থ সম্পর্কে তাদের ধারনা পাল্টে যায়। উন্নত প্রযুক্তির নিত্যনতুন সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণের মাধ্যমে ভøামিদির পুতিন আমেরিকান সামরিক কর্তৃত্বকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ করেন। শুধু সিরিয়া নয়-প্রয়োজনে ইরাক, লিবিয়া এবং ইয়েমেনে অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দেন ভøামিদির পুতিন। সাবেক সৌভিয়েত আমলের সেকেল ধরনের সমরাস্ত্রের পরিবর্তে পশ্চিমা শক্তির বিপরীতে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীকে আধুনিকায়ন দ্রæততার সাথে চলছে। ওয়াশিংটনের ভবিষ্যতে তারকা যুদ্ব ’স্টার ওয়্যার”কে সামনে রেখে রাশিয়াও ইতিমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। যুদ্ধকাজে ব্যবহৃত উপগ্রহ বিধ্বংসী প্রযুক্তি অনেক আগেই আয়ত্ব করেছে রাশিয়া। আমেরিকার ১২টি বিমানবাহী যুদ্ব জাহাজের বিপরীতে রাশিয়ার কোন বিমানবাহী যুদ্ব জাহাজ না থাকলেও কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এসব যুদ্ব জাহাজের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি এগুলোকে ধ্বংশ করার প্রযুক্তিও দেশটির রয়েছে। সংখ্যায় নয়-বরং গুনগত মানসম্পন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্মাণে রুশ সমর বিজ্ঞানীরা তৎপর রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সাময়িকীর খবরে জানা গেছে। সম্প্রতি রাশিয়া শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ সামরিক নিয়ন্ত্রন কক্ষ চালু করে। সিরিয়া যুদ্বের যাবতীয় দিক নির্দেশনা নিয়ন্ত্রন কক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে। আমেরিকার সাথে পাল্লা দিয়ে পুতিনের নির্দেশে সামরিক নিয়ন্ত্রন কক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সিরিয়া যুদ্বে অংশগ্রহনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভøামিদির পুতিনের অবস্থান আরো মজবুত হয়েছে। আমেরিকার মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশা শাসিত দেশগুলো এখন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সৌদী আরবসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে রাশিয়া থেকে অস্ত্রশস্ত্র আমদানীর চুক্তিও সম্পাদন করেছে। ফান্সে সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্ব দিচ্ছে। বৃটেন-জার্মানীও একই পথ অনুসরন করছে। চীন, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া, ভেনিজুয়েলা, কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক অতীতের যেকোন সময়ের চাইতে শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভøামিদির পুতিনের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে ভøামিদির পুতিনের জয় জয়কার। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ভøামিদির পুতিন এখন চালকের আসনে।

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com