সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ-৬

সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ-৬

সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৯:৪১ অপরাহ্ণ | 80 বার

সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ-৬
কবি ও সাহিত্যিক সাদিকুর রহমান পরাগ:

সত্য কথা বলা যাবে না। লেখা যাবে না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না। সভা-সমাবেশ করা যাবে না। এই রকম অসংখ্য না-এর বেড়াজালে প্রতিনিয়ত দংশিত হচ্ছিল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু তাড়া বেড়ায় মানুষকে। স্বাধীন স্বদেশেই অবরুদ্ধ আমরা।
এরকম অসহনীয় পরিবেশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল দেশের মানুষ। স্বৈরাচারের চোখে চোখ রেখে পাঞ্জা লড়েছে প্রতিবাদী তারুণ্য। এ লড়াই শুধু রাজনীতির মাঠেই সীমিত ছিল না। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনেও এক ঝাঁক তরুণ সেদিন উচ্চারণ করেছিল সাহসের পক্তিমালা। চোখে-মুখে স্পর্ধিত দ্যুতি ছড়ানো তারুণ্য সেদিন মেতেছিল সৃষ্টিশীল উন্মাদনায়। । তাদের টগবগে শব্দমালা যেন জ্বলজ্বল করছিল দ্রোহের আগুনে। তাদের সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল আপসহীন লড়াইয়ে। সেই তরুণদের একজন কবি শিমুল মোহাম্মদ।
ওই সৃষ্টিশীল সময়কে, ওই ছন্নছাড়া সৃষ্টিপাগল মানুষগুলোকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল বলে আজকে আমার নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হয়।14925587_1707818619544844_1941416152471875263_n

স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর একাত্তরের ঘাতক-দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণআদালত সংঘটিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সম্পৃক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড নামে একটি দল নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়। এই সংগঠনটিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে আফজাল বাবু ছিল আহবায়ক আর আমি সদস্যসচিব। পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এফ রহমান হলের ভিপি কালাম ভাই এবং সূর্যসেন হলের ভিপি আফজাল ভাইকে আহবায়ক ও সদস্য সচিব করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। সেদিনের সেই ছাত্র কমান্ড গঠনে আরো অনেকের সক্রিয় অবদান ও অংশগ্রহণ ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের অবদান আমার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ছিল। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সবার নাম উল্লেখ করতে পারলাম না। এত ভূমিকার উদ্দেশ্য আসলে অন্য একজন মানুষ সম্পর্কে বলার জন্য। মানুষটি নাম সেই কবি শিমুল মোহাম্মদ।
ছাত্রকমান্ড গঠনের কিছুদিন পরেই ছিল রোজার ঈদ। বাবু বললো যে একটা ঈদ কার্ড করা দরকার। ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে গলির ভেতর অবস্থিত মৌসুসী প্রিন্টার্স নামের একটি প্রেস থেকে ঈদ কার্ড ছাপানো হয়। কার্ডে গতানুগতিক শুভেচ্ছা জানানোর পরিবর্তে তখন আমরা চার লাইনের ছো্ট্ট একটি কবিতা ব্যবহার করেছিলাম। ছোট তবে অসম্ভব শক্তিশালী চারটে লাইন। পড়ার পর যে কারো রক্ত গরম হয়ে উঠবে। লেখাটা ছিল-

’৭১-এ তখন আমি অনেক ছোট
মৃত্যু বুঝি, যুদ্ধ বুঝি না
এখন আমি অনেক বড়
যুদ্ধ বুঝি, মৃত্যু বুঝি না।

পরবর্তীতের এই চারটি লাইন দিয়ে আমরা পোস্টার করেছি। স্টিকার করেছি। দেয়াল লিখনেও ব্যবহার করেছি। সে-সময় খুব দ্রুত জনপ্রিয় উঠে এই চারটি লাইন। আন্দোলন-সংগ্রামে-সভা-সমাবেশে-বক্তৃতায় উচ্চারিত হতে থাকে কবিতাটি।
হঠাৎ একদিন শিমুল ভাই এসে টিএসসিতে আমাকে পাকড়াও করলেন। শিমুল ভাই মানে সেই কবি শিমুল মোহাম্মদ। বললেন,
-আমার কবিতা ব্যবহার করলি, তুই আমার নামটা দিলি না।
-শিমুল ভাই, চিন্তা করছেন আপনার এই চারটা লাইন কীভাবে মানুষকে উদ্দীপত করছে।
-সেইটা ঠিক।
-কিন্তু মানুষতো জানলো না কবিতাটা কার লেখা।
-স্বীকার করতাছি যে নামটা না দেওয়া অন্যায় হইছে। তবে কবিতা বাইচ্যা থাকলে মানুষ কিন্তু ঠিকই কবিকে চিনে নেয়।
-কথাডা খারাপ কস নাই। ঠিকই কইছোস। তবে তোরে অনুরোধ করতাছি এরপর থেকে আমার নামটা কিন্তু মানুষরে জানাবি।

সেদিন শিমুল ভাইকে বলেছিলাম যে, সবাইকে জানাবো এই অসামান্য সৃষ্টির স্রষ্টা তিনি।parag

তারপর বলা নেই, কওয়া নেই, একদিন কাউকে কিছু না বলে শিমুল ভাই চলে গেলেন। চলে গেলেন সেখানে, যেখানে গেলে আর কেউ ফেরে না। আজ শিমুল ভাইয়ের জন্মদিন।

শিমুল ভাই আপনার সেই অসামান্য চারটি লাইন, পারমাণবিক বোমার সমান শক্তি সম্পন্ন ওই চারটি লাইন যা আমাদেরকে সাহস জুগিয়েছিল ঘাতক-দালাল বিরোধী আন্দোলনে- আজকে সবাই জানে তার লেখক কবি শিমুল মোহাম্মদ।

মানুষ সিরিজে আজকের পর্বে সেই মানুষটির জন্মদিনে আমাদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে মুজিব সেনাকে বানানো হচ্ছে জিয়ার সৈনিক!

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com