সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ – ১১

রবিবার, ০১ এপ্রিল ২০১৮ | ৭:৩৫ অপরাহ্ণ |

সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ – ১১

সাদিকুর রহমান পরাগ :বলা নেই-কওয়া নেই, মাঝ রাতে হুট করেই মরে গেল লোকটি। শ্যামলীতে যে চার তলা বাসাটিতে সে থাকতো, এর মালিক তারই এক বন্ধু। সেই বন্ধুর কল্যাণেই স্ত্রী-সহ এই বাড়িতেই তার ঠাঁই হয়েছিল। সেই সময়টা ছিল তার জীবনের একটা ক্রান্তিকাল। তখন যদি বন্ধুটি তার পাশে না দাঁড়াতো তাহলে খুব বিপদেই পড়ে যেত। কারণ তখন সব কিছু থেকেও ভদ্রলোকের কিছুই ছিল না।
বন্ধুর নানাবিধ ব্যবসায়িক ব্যস্ততা। দম ফেলবারও সময় নেই। তার মধ্যে শ্যামলিতে নতুন একটি বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু করতে হবে। এ সময় বন্ধুটির দরকার পড়ে একজন বিশ্বস্ত মানুষের। আর তাই বন্ধুটি খুশি মনেই তাকে বাড়িটি নির্মাণ কাজ তদারকির দায়িত্ব প্রদান করে। নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে যাবার পরও তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় বাড়িটি দেখে-শুনে রাখার জন্য। সেই থেকেই লোকটি ছিল এখানেই। স্বামী-স্ত্রী দুজন মাত্র মানুষ। এটি অবশ্য তার দ্বিতীয় স্ত্রী। দ্বিতীয়বার বিয়ে করা নিয়েই লোকটির জীবনের মোড় ঘুরে গেছে। এ ঘটনাটি তার সেই বন্ধুটি ছাড়া এই এলাকার কেউ জানে না।
ঘটনাটি জানার জন্য আমাদের একটু পিছনে যেতে হবে। একটা সময় ছিল যখন ভদ্রলোকের সব কিছুই ছিল। পুরোনো ঢাকায় নিজের বাড়ি। অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল। এলাকার সবাই তাকে চিনে-জানে। একজন নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে তাকে সম্মানও দেয়। স্ত্রী-সন্তান নিয়েই তার সুখে দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তার জীবনের ছন্দ পতন ঘটে।
অকস্মাৎ তার স্ত্রী বিয়োগ হয়। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্তানদের মানুষ করার পিছনেই কেটে যায় তার সময়। একটা সময় ছেলেমেয়েরা বড় হয়। পড়ালেখা শেষ করে যার যার কর্মজীবনে প্রবেশ করে। ওরা ভীষণ ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। বাবাকে দেওয়ার মতো সময়ও তাদের কাছে নেই।
নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হয় লোকটির। দায়িত্ব ও কর্তব্যের ঘেরাটোপ যেন তার প্রাণশক্তিকে শুষে নিয়েছে। তার জীবনে কোন শখ নেই, আল্লাদ নেই, চাওয়া-পাওয়া নেই….শুধু দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। তার উপর সন্তানরাও ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ একলা হয়ে পড়ে, ক্ষয়ে যেতে থাকে সে। বাইরে থেকে কেউ বোঝে না তার এই নিঃসঙ্গতা। শামুকের মতো গুটিয়ে থাকে সব সময় নিজের ভেতর।
এ রকম সময়ে ঘটনাক্রমে তার পরিচয় ঘটে স্বামী হারা নিঃসন্তান অসহায় এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে। মহিলাটি তার আরেক বন্ধুর দুর সম্পর্কের আত্মীয়। বন্ধুর অনুরোধে বিপন্ন মহিলাটিকে সাহায্যে জন্য তাকে এগিয়ে যেতে হয়। মহিলাটির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। মহিলাটির সান্নিধ্যে এলে খুব ভালো লাগে তার। কথা বলে বুঝতে পারে যে তার মতো মহিলাটিও ভীষণ একা। এভাবে পরস্পরের একাকীত্বকে স্পর্শ করে দু’জন নিঃসঙ্গ মানুষ পরস্পরের কাছে চলে আসে। ক্রমশঃ তারা এক অন্যের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
একদিন তারা সিদ্ধান্ত নেয় নতুন করে জীবন শুরু করার। কাউকে না জানিয়ে হুট করে বিয়ে করে ফেলে। বাবার বিয়ের খবরে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে লোকটির ছেলেমেয়েরা। মানুষ কী ভাববে, লোকসমাজে কীভাবে তারা মুখ দেখাবে- সেই সব বিষয় নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বাবার সঙ্গে সন্তানরা ভীষণ দুব্যর্বহার করে, যা-তা কথা শোনায়। জন্মদাতা পিতা-কেই তারা অস্বীকার করতে চায়। কেউ লোকটিকে বোঝার চেষ্টা করে না। যে লোকটি তাদের জন্য সারাটা জীবন ব্যয় করলো, আজকে তারাই তাকে দূর দূর করছে। সন্তানের আচরণে ভীষণ কষ্ট পায়। লোকটি ভাবে অনেক হয়েছে, আর নয়। সন্তানদের ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। তবে চলে আসার আগে তার সব সম্পত্তি সন্তানদের দিয়ে আসে। পিতার চলে যাওয়াতে সন্তানরা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
আসার আগে মাথা গোঁজার ঠাঁই-টুকুও দিয়ে এসেছে সন্তানদের। পিতাকে স্বীকার করতে না চাইলেও, পিতার সম্পত্তি নিতে তাদের কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু কোথায় যাবে লোকটি?
কীই বা করবে এই বয়সে? কীভাবে চলবে দিনকাল। তার উপর আরেকটা মানুষের দায়িত্ব।
সেই সময়ে বন্ধুর শ্যামলির বাড়িটি তদারকির কাজটি সে পেয়েছিল।
নতুন কাজ। নতুন সংসার। তাই ব্যস্ততাও ভীষণ। এক সময় বাড়ির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। বন্ধুর অনুরোধে থেকে যায় ওই বাড়িতে কেয়ারটেকার হিসেবে।
বুকের ভেতরের কষ্টটাকে চেপে রেখে দিন কেটে যায়। কাউকে বলে না নিজের কষ্টের কথা। এক শহরে থেকেও সন্তানদের সঙ্গে তার দেখা হয় না। সন্তানরাও কখনো বাবার খোঁজ নিতে আসে না।

বুকের চাপা কষ্টটাকে সঙ্গে নিয়েই লোকটি চলে যায় পরপারে। মৃত বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে সন্তানরা কেউ-ই আসেনি।

মারা যাবার মূহুর্তটিতে লোকটির কি ইচ্ছে করছিল সন্তানদের মুখটি একবারের জন্য দেখতে?

এর উত্তর কোনদিনও জানা যাবে না।

নোয়াখালীতে যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com