সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ – ৯

শুক্রবার, ০৫ জানুয়ারি ২০১৮ | ১১:২৫ অপরাহ্ণ | 37 বার

সাদিকুর রহমান পরাগ এর লেখা: মানুষ – ৯

মানুষ – ৯

মোবাইল ফোন তখনো এত ব্যাপক হয়নি। সবার বাসায় টিএন্ডটির ল্যান্ডফোন ছিল না । কারো বাসায় টিএন্ডটির ল্যান্ডফোন থাকা মানে তো বিরাট একটা ব্যাপার। আর এই ফোন পাওয়াটা সহজও ছিল না। এর জন্য বহু কাঠখড় পোড়াতে হতো। এত সব হুজ্জুতের মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে আমাদের বাসায়ও ছিল টিএন্ডটি’র ফোন। একদিন সকালের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে বাসার ফোনটা বেজে উঠে। ঘুমটাকে তাড়াতে ইচ্ছে করছিল না। ঘুমের রেশটাকে আঁকড়ে রেখে ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে জানতে চাইলো, পরাগ আছে।
-বলছি, কে বলছেন।
-আমি রতন।
-কোন রতন?
-কয়টা রতনকে চেনো?
স্মৃতি হাতড়াতে গেলে তো ঘুমের রেশটাও ছুটে যাবে। কিন্তু কী আর করা।
স্মৃতি ঘেটে বলতে থাকি, চিনিতো অনেক রতন-কে। এর মধ্যে নারিন্দাতে আমার এক বন্ধু ছিল রতন, অনেকদিন যোগাযোগ নেই। চিনি ছাত্রলীগের নেতা আবদুল হান্নান রতন, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আবদুল্লাহ আল কাফি রতন, গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়নের (পরে বাংলাদেশে ছাত্রমৈত্রীর সঙ্গে একীভূত) রতন ভাই…..কথাটা আর শেষ করতে পারলাম না।
অপর প্রান্ত থেকে বললো, আমি নারিন্দার রতন।
আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। এতদিন পর রতন! কোত্থেকে?
আমাদের তুমুল তারুণ্যের বন্ধু রতন। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক সঙ্গে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করেছি। বাবরি মসজিদের ঘটনায় যখন বিভিন্নস্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল, তখন এক সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে অশুভ তৎপরতাকে প্রতিহত করতে লড়াই করেছি। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের কাছে অর্থ থাকতো না। এমনকি অনেকের কাছে খাওয়ার টাকাও থাকতো না। রতন বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এসে খাবারের ব্যবস্থা করতো।
হঠাৎ এক সকালে জানতে পারি রতনরা চলে গেছে। বাড়ি-ঘর সব ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে কখনো কল্পনাও করিনি। না বলে রতন এভাবে চলে যাওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
অনেকদিন সেই রতনের ফোন! তারপর দেখা হলো। অনেক কথা হলো। কথা বলতে বলতে একটা সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। সবই বললো- কেন তারা চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
চলে যাওয়াটাই কি সমাধান, থেকে কি লড়াই করা যায় না, আরো মানুষরা আছে না, ইত্যাদি ইত্যাদি নানারকম প্রশ্ন হয়তো করা যেতে পারে। অনেক বির্তকও হয়তো হতে পারে। কিন্তু সেসব প্রশ্নের চেয়েও যে প্রশ্নটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, কতটা অস্তিত্বহীন মনে হলে, কতটা বিপন্ন মনে হলে- একজন মানুষ জন্মভূমির সঙ্গে সর্ম্পক ছিন্ন করতে পারে?

উত্তর পাই না। নিজেকেই অপরাধী মনে হয়।
সংখ্যার বিচারে আমরা যারা নিজেদের গরিষ্ঠ গোত্র বলে ভাবি, তারা হয়তো কখনো বিপন্নতার এই বোধটাকে অনুভব করতে পারবো না।
রতনের প্রসঙ্গ ধরেই আরেকটি ঘটনার কথা বলি। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে মানুষ-৪ পর্বে ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউ অব বাংলাদেশে নামে একটা জার্নালে কাজ করার ব্যাপারটি উল্লেখ করেছিলাম। সেই কাজের জন্য আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছিল।
সেবার ছিলাম যশোর। অন্ধকার থাকতে থাকতে বাস এসে থামলো দড়াটানার মোড়। বাস থেকে নেমে যাত্রীরা সবাই ভোরের আলোর অপেক্ষায় রইলো। আমাদেরকেও অন্যরা সাবধান করে দিলো আলো না ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। রাস্তা-ঘাট নাকি ভালো না, বিপদ হতে পারে। অগত্যা আমরাও আলোর অপেক্ষায় রইলাম।
সকাল বেলা বিখ্যাত জামতলার মিষ্টি দিয়ে নাস্তা করে গন্তব্যের দিকে বেরিয়ে পড়লাম। যশোর শহরের যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে সেটি হচ্ছে সেখানকার রাস্তার নাম। হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন মানুষের নামে নামকরণকৃত সড়কগুলো তখনো সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়নি। বাংলাদেশের একটি শহরে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী সুভাষ বোস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে সড়ক আছে ভাবাই যায় না। রাস্তার নামগুলো যেন বলে দেয় সাংস্কৃতিকভাবে কতটা ঋদ্ধ এই এলাকা।
আমাদের কাজের নির্ধারিত এলাকা ছিল ঝিকরগাছা উপজেলা। তাই সেখানে যেতে হয়েছে। ওখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন খুবই সজ্জন একজন মানুষ। তিনি আমাদের অনেক উৎসাহ দিলেন, ডাক বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। আর বিশেষভাবে সাবধান করে দিলেন, যেখানেই যাই সন্ধ্যার পর যেন বাইরে না থাকি। ওই এলাকাতে তখন চরমপন্থি রাজনীতি প্রতাপ। শ্রেণীশত্রু খতমের নামে প্রায়শই খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। এরকম খুনের ঘটনা ঘটলে স্থানীয়রা নির্বিকারভাবে বলে যে, ঝাড়িছে। তারা খুব সতর্কভাবে চলাফেরা করে।
কাজের প্রয়োজনে যেখানেই গেছি, সবখানেই আমাদেরকে এই ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে। তাই সন্ধ্যার পর বাইরে দূরে কোথাও যাই না। ডাক-বাংলোর আশপাশে ঘুরাঘুরি করি। ডাক বাংলোতে দুটি ঘর। যে ঘরটিতে আমরা ছিলাম, সেই ঘরের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। সবার কথা শুনে এতটাই আতংকিত হয়ে পড়ি যে ওই ঘরের রাস্তার পাশের জানালাটিও রাতের বেলা বন্ধ রাখি।
পাশের ওই রাস্তা দিয়ে গভীর রাতে মানুষের আনাগোনা, হল্লাগোল্লা। প্রথম দিন রাতে ঘুমাতে খুব সমস্যা হয়। ভয়ে আমরা জানালা খুলি না। আমার ভাবলাম রাতের পার্টির (স্থানীয়রা বলে রেতের পার্টি) লোকজন হতে পারে। কী দরকার বাবা অতি আগ্রহ দেখিয়ে বাঁশকে কাছে ডেকে আনার।
পরেরদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় ডাক বাংলোর বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কেয়ারটেকার আমাদের জন্য চা আর মাখা মুড়ির ব্যবস্থা করেছে। হঠাৎ দেখি ৩৫/৪০ জনের একটি দল। ডাকবাংলার পাশের সরু রাস্তাটি দিয়ে সার বেঁধে হেঁটে যাচ্ছে । নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশু সবই আছে সেই দলে। সবার সামনে ধুতি পড়া একজন একটু কুঁজো হয়ে একটা লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বয়স ৮০-এর কাছাকাছি। সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্যটি একজন শিশু মায়ের কোলে।
আগ্রহ ধরে রাখতে না পেরে কেয়ারটেকারের কাছে জানতে চাইলাম ওরা কারা, কোথায় যাচ্ছে। কেয়ারটেকার যা বললো তার সারমর্ম হচ্ছে, এরা দেশ ছেড়ে চিরতরে ভারত চলে যাচ্ছে। আমাদের ডাকবাংলার পাশের সড়কটি দিয়ে একটু সামনে গেলেই যে বাড়িটি রয়েছে সেখানে একজন দালাল থাকে। সেই ওদের নিয়ে যাচ্ছে। ওর লাইন-ঘাট নাকি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। সবখানেই তার লোক রয়েছে। সম্পূর্ণ গ্যারান্টি দিয়ে সে বর্ডার পার করিয়ে দেয়। এজন্য অবশ্য বাড়তি টাকা গুণতে হয়। যারা দেশ ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে চায়, তারাই রাতে এসে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে। অর্থকড়ির বিষয়টি দফারফা হলে, সে একেকটা কাফেলা নিয়ে ওপারে দিয়ে আসে। এই রকম একটি কাফেলা সেদিন আমরা দেখেছিলাম।
বারান্দায় বসে ওদের দিকে তাকিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আমার মাথায়। উত্তরহীন সেই যন্ত্রণা থেকেই এক সময় লিখলাম-
তীব্র দহন জ্বালা গায়ে মাখা ধূলিকণায়
অজানা আতংক ভর করে তরুছায়ায়
ঝিরিঝিরি বাতাসে যেনো অশুভ স্পর্শ
ভাঙ্গনের হুংকার শান্ত নদীর স্রোতে
মুখোশে ঢেকে যায় প্রিয় মুখগুলো
মানুষের চেয়েও মূল্যবান পোড়ামাটি
হায় কী অভিশপ্ত জীবন!
কতটা টলে উঠলে বিশ্বাসের ভিত
সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় শেকড়ের সঙ্গে
কতটা নষ্ট হলে মানবিক বোধ
দুঃসহ মনে হয় নিজের জীবন
কতটা গভীর হলে অন্তর্গত ক্ষরণ
ছেড়ে যেতে হয় পূর্বপুরুষের ভিটে
সংখ্যার গুরু-লঘু দ্বন্দ্বে হায়
অচেনা হয়ে যায় প্রিয় মাতৃভূমি
পোড়া ভিটেতে পড়ে থাকা লাশের
উপর হামাগুড়ি দেয় বিপন্ন মানবতা

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে মুজিব সেনাকে বানানো হচ্ছে জিয়ার সৈনিক!

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com