পঞ্চগড় চিনিকলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতঃ প্রতিবছর লোকসান ৪০-৪২ কোটি টাকা

বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১২:১২ অপরাহ্ণ |

পঞ্চগড় চিনিকলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতঃ প্রতিবছর লোকসান ৪০-৪২ কোটি টাকা

প্রতি বছর লোকসান গুনতে গুনতে চিনি শিল্প সংস্থা কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিয়ে আনলেও কমছেনা পঞ্চগড় চিনিমিলের লোকসান। পঞ্চগড়ের বৃহৎ ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান পঞ্চগড় চিনিকল। এ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা হাত বদল হওয়াসহ অত্রাঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ নানাভাবে উপকৃত হলেও প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বহু বছরের পুরনো এ চিনিকলটির আধুনিকায়নের কাজ করা অনেক আগে জরুরী হয়ে পড়লেও এখনো উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। উন্নয়নমূলক কাজ করে শিল্প প্রতিষ্ঠানটিকে বহুমুখী উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত না করার পাশাপাশি উন্নত জাতের আখ উৎপাদন ও মাড়াইয়ের ব্যবস্থা গ্রহন, চিনি ও আখের মূল্যের সমন্বয়, চিনি বাজারজাত ও বিক্রিসহ ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে প্রতিবছর চিনিকলটি ৪০ থেকে ৪২ কোটি টাকা লোকসান গুনছে। এই ৪০-৪২ কোটি টাকার মধ্যে ২৫ থেকে ২৬ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে। চিনি উৎপাদন বাবদ প্রতিবছর সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স দেয়া হচ্ছে দেড় থেকে ২ কোটি টাকা। এ অবস্থায় এখন পর্যন্ত চিনিকলটির লোকসানের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। আর ব্যাংক ঋণের দায়ভার দাঁড়িয়েছে ১৮৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, পঞ্চগড় চিনিকলটি ৫১ বছর আগে নির্মিত। জরাজীর্ণতার কারণে প্রতিবছর চিনিকলটির লোকসানের পরিমান বেড়ে চললেও এ শিল্প প্রতিষ্ঠানটির এখনো প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সরকারিভাবে ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করার পাশাপাশি বহুমুখী উৎপাদনের জন্য আধুনিকায়নের কাজ করা হলে চিনিকলটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের পুরনো নীতিমালায় চিনিকলের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়াসহ উন্নতজাতের আখের পরিবর্তে নি¤œজাতের আখ আবাদের পাশাপাশি চিনি ও আখের মূল্যের সমন্বয় না করার কারণে এ বছরও চিনিকলটিকে বড় অংকের লোকসান গুনতে হবে। চিনিকলটিতে বর্তমানে চলতি মৌসুমের আখ মাড়াই কার্যক্রম চলছে। এ মৌসুমে ৮১ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। চিনি আহরণের হার ধরা হয়েছে ৭ শতাংশ। কিন্তু এখনো ৬ শতাংশ চিনি আহরণের হার উঠেনি। নিম্ন জাতের আখের কারণে রসের পরিমান কম হওয়ার জন্য চিনি আহরণের হার বাড়ছেনা। সুগার ক্রোপ ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতো প্রতিবছর নি¤œজাতের আখের আবাদসহ মাড়াই করা হচ্ছে। সুকৌশলে লোকসানের পরিমান বাড়িয়ে চিনিকলটিকে রুগ্ন শিল্পে পরিণত করা হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছে। ওই সূত্রটি জানান, পর্যায়ক্রমে আখের মূল্য বাড়ানো হলেও চিনির দাম বাড়ানো হয়নি। এটিও লোকসানের আরেকটি কারণ। বর্তমানে প্রতিমণ আখের মূল্য ১৪০ টাকা। আর প্রতিকেজি চিনির মূল্য ৫০ টাকা। আখের মূল্য অনুযায়ী প্রতিকেজি চিনির মূল্য ৮০ টাকা হওয়া প্রয়োজন। চিনিকলের চিনি স্বাস্থ্যসম্মত ও মিষ্টি বেশি হলেও ৫০ টাকা কেজি দরের চিনি বিক্রি হচ্ছেনা। বর্তমানে চিনিকলের গুদামে গত বছরের ৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যার মূল্য ২৫ কোটি টাকা। বেসরকারী চিনি কারখানাগুলো বেশি সুযোগ সুবিধা দেয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা চিনিকলের চিনি বিক্রিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেনা।নিয়মিত চিনি বিক্রি না হওয়ার জন্য চিনিকল কর্তৃপক্ষ শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ভাতা দিতে পারছেনা। বেতন ভাতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য র্কর্তৃপক্ষকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চিনি খাদ্য শিল্প করপোরেশন ব্যাংক ঋণ করলেও এ ঋণের সুদ চিনিকলকে দিতে হওয়ার জন্য ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। অনেক সময় অবসরগ্রহণকারী কর্মচারী ও বেতন ভাতা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের টাকার পরিবর্তে চিনি নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে এসব কর্মচারী সরকারি দামে চিনি নিয়ে কম দামে ব্যবসায়ী ও হোটেলে বিক্রি করার জন্য তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চগড় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনুর রেজা লোকসানের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চিনিকলটির বয়স প্রায় ৫১ বছর। প্রতিবছর আখ মাড়াই কার্যক্রম চালাবার জন্য চিনিকলের কিছু সংস্কারমূলক কাজ করা হয়। কিন্তু অনেক পুরনো হওয়ায় চিনিকলটির আধুনিকায়নের কাজ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। আধুনিকায়নের কাজ করা হলে চিনিকলটিতে চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নতমানের বোতলজাত পানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে চিনিকলটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। তিনি বলেন, সুগার ক্রোপ ইনস্টিটিউটের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আখের আবাদ করছি। চিনি বিক্রি না হওয়ার জন্য আমরা নিয়মিত শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছিনা।এদিকে দুমাস চারমাস পর বেতন দিলেও ১৬% ভাগ কেটে নিচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষ বলে ক্ষোভ জানান অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এবছর মাড়াইয়ের শুরুতে আখচাষীদের আখের টাকা দিচ্ছেনা চিনিকল কর্তৃপক্ষ। ফলে মাঠ পর্যায়ে আখ ক্রয় কেন্দ্রগুলিতে প্রতিনিয়ত টাকার জন্য হন্য হয়ে ঘুরছে পাওনাদার আখচাষীরা। পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাটের বড় মাপের আখচাষী মো. জসিয়ার রহমান বলেন, এ বছর চিনিকল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে ৪ একর জমিতে আখ চাষ করেছিলাম। ইতোমধ্যে ৫০ মে.টন আখ মিলে দিয়েছি। আমি আখের বকেয়া পাবো প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। এরপর গত জানুয়ারীর ২৭ তারিখ হতে আখ চাষীদের টাকা দেয়া বন্ধ করে দেয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ। আখচাষী জসিয়ার রহমান বলেন, আমরা পর পর দুদিন এর পাওনা পরিশোধের দাবীতে চিনিকলে মানবন্ধন করি। কিন্তু পাপওনা পরিশোধে কোন সাড়া নেই। তিনি আরো জানান, পাওনা পরিশোধে মানববন্ধন করার ক্ষেত্রে বাধা দেয়া হচ্ছে। চিনি শিল্প চেয়ারম্যান প্রতিবাদ সমাবেশ করতে বলেছে এবং এ মর্মে চিঠি দিয়েছে। অথচ এম,ডি চেয়ারম্যান আখ লাগাতে বলেছে। আখচাষী জসিয়ার রহমান অভিযোগ করেন যে, তারা আখ লাগাতে বলবে আবার টাকাও দিবে না। তাহলে আমরা কেন আখ লাগাবো। বাড়ীর টাকা দিয়ে আখ লাগাবো, আবার তাদের ধমক-চমক খাবো। তাই আমি আখের সব মুড়ি তুলে ফেলেছি। আর আখ লাগাবোনা। দেশের বাহির হতে চিনি আমদানী করবে আর দেশের চিনিকলের চিনি বিক্রি হবেনা। আর আমরা টাকা পাবেনা তা কি হয়।

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com