ব্রেকিং নিউজ

x

অর্থবহ স্বাধীনতা; প্রয়োজন গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন

সোমবার, ২৬ মার্চ ২০১৮ | ২:২৪ অপরাহ্ণ | 139 বার

অর্থবহ স্বাধীনতা; প্রয়োজন গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন

মোহাম্মদ ঈমাম হোসেইন: 

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। একথা যেমনি সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে একটি স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা। কোনো একটি দেশ, জাতি, সমাজ অথবা গোষ্ঠী যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন তাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করে অর্থবহ করার জন্য জাতির মাঝে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের সকল  শক্তি নিয়োগ করার মাধ্যমে দেশকে স্বনির্ভর করে তৈরি করা। যদি স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির লোকেরা অনৈক্য অবস্থায় থাকে অথবা নিজেদের মাঝে সংঘাতে লিপ্ত থাকে,তাহলে তাদের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পরও ফলপ্রসূ হবে না। অর্জিত স্বাধীনতা যদি অরক্ষিত হয়ে যায় তাহলে অরক্ষিত স্বাধীনতাই হবে পরাধীনতা।
স্বাধীনতা শব্দটি পৃথিবীর সবার কাছেই মধুর মতো। আসলে এই স্বাধীনতা শব্দটির কখন থেকে শুরু হয়েছে তার কোনো সঠিক ইতিহাস আমার জানা নেই। তবে একথা বলতে পারি যে যখন থেকে পরাধীনতার শুরু, তখন থেকেই স্বাধীনতার আবিষ্কার স্বাধীন শব্দের অর্থ মুক্ত বা বাধাহীন। অর্থাৎ স্বাধীনতা হলো অন্যের অধীনতা থেকে মুক্ত থাকা। কোনো একটি দেশ তখনই  স্বাধীনতা লাভ করে, যখন অন্যান্য দেশ তাদের উপর অন্যায়ভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।
স্বাধীন দেশের লোকেরা তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারসহ সকল প্রকারের ন্যায্য অধিকার পাবে।
পরাধীনতা হলো স্বাধীনতার বিপরীতার্থক শব্দ। যা মানুষকে অন্যের গোলামীতে আবদ্ধ করে অন্যের অধীনে চলতে বাধ্য করে। মানুষকে স্বাধীন ব্যক্তিসত্ত্বা বলতে কিছুই থাকে না। সে আস্তে আস্তে তার সকল প্রকার অধিকার হারিয়ে অন্যের ইচ্ছা প্রতিষ্ঠার জন্য গোলাম হয়ে বাহিরের একটি পেশী শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়।
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আজ একবিংশ শতাব্দীর যুগে  সকল সময়ের মানুষ সর্বাবস্থায় পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য চেষ্টা করে আসছে। এমনকি এ স্বাধীনতার জন্য নিজের প্রিয় জীবনকেও বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করেনি। মানব জাতি ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর মাঝে হয়তো পরাধীনতা থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা কম। বা থাকলেও তা না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে মানুষ সব সময় স্বাধীন ভাবে থাকতে চায়। যে কারণে সর্বাবস্থায় পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে। কোনো একটি স্বাধীন জাতি যদি বিশ্বের বুকে স্বনির্ভর উন্নত জাতি হিসেবে বেঁচে থাকতে চায় তাহলে অবশ্যই তাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হবে।
অর্জিত স্বাধীনতা  হলো মানুষের পরাধীনতা থেকে মুক্তির প্রথম সোপান। যখন কোনো একটি জাতি বা দেশের লোকেরা অন্যের অধীনে শোষণ থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে নিজেদের শ্রম, মেধা, সময়, অর্থ ও রক্ত সর্বোপরি জীবন বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। তখনই তাদের অর্জিত স্বাধীনতা সফলতার প্রথম ধাপ অতিক্রম করে। আর তা মানুষকে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখাতে শেখায়, প্রয়োজন হয় স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।
একটি স্বাধীনতা অর্জন করেই মানুষের কাজ সমাপ্ত হয় না। কাজের শুরু হয়। অর্জিত স্বাধীনতাকে অতীতের সকল জুলুম,নির্যাতন,নিষ্পেশন ও অত্যাচার থেকে মুক্ত করে যখন নিজেদের সকল নাগরিক অধিকারকে নিশ্চিত করা যায় তখনি কেবল ঐ স্বাধীনতা অর্থবহ হয়। আর স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষ বিপক্ষসহ দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল সামাজিক, রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শ্রেণীকে অবশ্যই একসাথে দেশ গড়ার কাজ করতে হবে। নচেৎ স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা যাবে না।
ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি কাজ করা। একটি কাজের ব্যাপারে সকলের সমান সহযোগিতা বা অংশগ্রহণ না পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
তবে যখন কোন একটি ঘটনা ঘটে যায় তখন অবশ্যই দেশের সকল শ্রেণীকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা জরুরি। আমরা যদি ১৯৪৭ সালের আগে ভারত বর্ষের রাজনৈতিক অবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, ১৭৫৭ সালের নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ইংরেজদের প্রায় দুইশত বৎসরের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্য এ উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানসহ সকল শ্রেণীর লোকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছিল। যখন ইংরেজরা উপমহাদেশকে স্বাধীন করে দেয়ার ঘোষণা দেয়,তখনি বড় দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। কংগ্রেস এক জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে প্রচার করতে থাকে হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই ভারত মাতার অঙ্গছেদ নেই। পুরো উপমহাদেশ হবে একটি রাষ্ট্র। কিন্তু মুসলিম লীগ দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে প্রচার করতে থাকে হিন্দু মুসলিম আলাদা- দুটি জাতি কখনোই এক হতে পারে না।
মুসলমানদের জন্য অবশ্যই আলাদা রাষ্ট্র হবে। আমরা এখানে একটি জিনিস লক্ষ্য করতে পারি যে, স্বাধীনতা অর্জনের ব্যাপারে হিন্দু-মুসলিম এক ছিল। কিন্তু কেউ ভারতকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে চেয়েছে আবার কেউ হিন্দু-মুসলিমদের জন্য আলাদা আলাদা রাষ্ট্র চেয়েছে। ইংরেজরা যখনি ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষকে হিন্দুদের জন্য ভারত ও মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি করে তখনি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাঝে বিপরীত পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যারা এতদিন এক জাতি তত্ত্বের পক্ষে ছিল তারাই আবার পাকিস্তানে রাজনীতি করছে। আর যারা দ্বি-জাতি তত্ত্বের পক্ষে ছিল তারাও ভারতে রাজনীতি করছে। এবং প্রত্যেকেই তাদের দেশকে গড়ার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে কাজ করছে। তাহলে আমরা এখন একথা বলতে পারি যে, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে অবশ্যই দেশের সকল শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন। যদি না ১৯৪৭ সালের পরে ভারত পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ না হয়ে একে অন্যকে স্বাধীনতা বিরোধী,স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি মনে করে দোষারূপের রাজনীতি করতো তাহলে হয়তো তাদের স্বাধীনতা অর্জিত হতো, রক্ষা হতো না। অরক্ষিত স্বাধীনতাকেই পরাধীনতা বলা হয়।
আমি এবার বিশ্বের অন্য কয়েকটি দেশের কথা উল্লেখ করতে চাই। যেখানে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকার পরও স্বাধীনতার পরে দ্রুত উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হয়। মালয়েশিয়ার কথাই এখানে উল্লেখযোগ্য। যে রাষ্ট্রটি আমাদের থেকেও ১০ বছর পরে ১৯৫৭ সালে ইংরেজদের কাছ থেকে মুক্ত হয়েছিল তারাই আজকে বিশ্বের উন্নত দেশের কাতারে। তার একমাত্র কারণ হলো তাদের দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। এছাড়াও আমরা যদি ইউরোপ,আমেরিকার দেশগুলোর দিকে তাকাই দেখতে পাব যে, তারা সব সময় নিজেদের দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। যেমন আমেরিকার কথা এখানে বলা যেতে পারে। এই দেশটি বিশ্বের বুকে নিজেকে একক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যতো অন্যায় কাজই করুক না কেন, দেশের মানুষ যখন দেখলো যে, যুদ্ধের কারণে দেশ লাভবান হচ্ছে তখন সে দেশের জনগণ যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট জর্জ  ডব্লিউ বুশকে পুনরায় নির্বাচিত করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। নির্বাচনে আমেরিকার বড় দুটি রাজনৈতিক দল রিপাবলিক ও ডেমোক্রেট এর মধ্যে মতো বিরোধ থাকলেও যুদ্ধের ব্যাপারে প্রায় দুই দলই অভিন্ন নীতির কথা বললেন।
এর দ্বারা কি এটাই প্রমাণিত হয় না যে, দেশের স্বার্থে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে পরস্পর বিভেদ পরিহার করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের পক্ষে কাজ করতে হবে। আবার বিশ্বে এমন দেশের সংখ্যাও কম নয় যেখানে নেতৃস্থানীয় লোকদের দেশ বিরোধিতার কারণে অর্জিত স্বাধীনতা পরাধীনতায় পরিণত হয়েছে। আফগানিস্তানের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য এ দেশটির স্বাধীনতা হারানোর পেছনে বিদেশীদের চেয়ে তাদের  দেশের লোকেরাই বেশি দায়ী। আমরা এ কথা বলতে পারি যে, কোনো একটি কাজকে সফল করতে গেলে যেমন ঐক্যবদ্ধ পরিশ্রম দরকার, তেমনি একটি দেশের অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য ঐ দেশের সকল মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।
অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা যখন অনৈক্য নামক কালো থাবার কাছে হার মেনে জাতির ভবিষ্যৎকে দুর্বিষহ করে তুলে তখনি বুঝা যায় যে, অনৈক্যের কুফল কতটুকু। অর্জিত স্বাধীনতা যখন আস্তে আস্তে উইপোকার কাঠ খাওয়ার মতো শেষ হয়ে যায়, তখন আর কিছু করারও থাকে না। তাই যেই কোনো দেশের লোকদের স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথে দেশের সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য অবশ্যই কাজ করতে হবে। নচেৎ স্বাধীনতা অর্জন হলেও এর সুফল ভোগ হবে না। আমরা দেখেছি ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের কাছ থেকে পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান সহযোগে গঠিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীনতার তেইশ বৎসর অতিবাহিত করার পরও অনৈক্যও বিভেদের কারণে বিচ্ছিন্ন (আলাদা) হয়ে গিয়েছিল। আর বিভক্তির একমাত্র কারণ হলো দুই পাকিস্তানের লোকদের রাজনীতিতে সহাবস্থান না থাকা। আবার ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান নামক এলাকাটি বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হওয়ার পরও স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর আজ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের বর্তমানে পিছিয়ে থাকার একমাত্র কারণ হলো জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেণীর লোকদের মাঝে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ না করা। আর দেশের নেতৃস্থানীয় লোকদের সহনশীলতার অভাবে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার মুখোমুখি।
বাঙ্গালী জাতি হলো বীরের জাতি। যুগ যুগ ধরে এদেশের মানুষগুলো দেশের যে কোন সমস্যাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করেছিল। যার একটি বাস্তব প্রমাণ ১৯৪৭ সালের আগে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাঙ্গালীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। এবং ৪৭ এর পরে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুথান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে এসব কিছু আমাদের অতীতের গৌরবময় ইতিহাস বহন করে। এতসব আন্দোলনে কোন একটি দল বা গোষ্ঠী এককভাবে অংশগ্রহণ করেনি। বরং দলমত নির্বিশেষে এদেশের সকল শ্রেণীর লোকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলন সংগ্রাম সফল হয়েছিল। সুতরাং এর কৃতিত্ব সবাই পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় হলো ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় তখন এদেশের সকল শ্রেণীর লোক দলমত নির্বিশেষে স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তবে ভারতের সহযোগিতা নিয়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে কিছু রাজনৈতিক দলের মাঝে মতো বিরোধ সৃষ্টি হয়। যার ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কয়েকটি ইসলামী ও বামপন্থী রাজনৈতিক দল  যুদ্ধে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে।
স্বাধীনতা আন্দোলন ও সংগ্রামের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ কালো রাত্রি থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে আমরা আমাদের অনেক কিছুকে হারিয়ে যখন স্বাধীনতার লাল সূর্যটিকে পেলাম তখন আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটির দরকার ছিল,তা হলো ঐক্যবদ্ধ ভাবে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ দেশের কিছু রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণী একলা চলো নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে জাতির মাঝে নতুন করে যুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষের দুটি শ্রেণী তৈরির মাধ্যমে অনৈক্য সৃষ্টি করে। যার ফলে যুদ্ধ বিধস্ত এ  দেশটি স্বাধীনতার পর পরই অবহেলিত অবস্থায় পড়ে যায়। আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে থাকে রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে। ফলশ্রুতিতে আমাদের জন্য বয়ে নিয়ে আসে ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ, ৭৫ সালের বাকশালের নামে এক দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবারের নির্মম হত্যাকান্ড, ৭ নবেম্বরের সিপাহী বিপ্লবসহ অনেক অনিবার্য সংঘাত। যার ফলে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতা নতুন করে হুমকির মুখে পড়ে।

১৯৭৫ পরবর্তী এদেশে কখনো সামরিক স্বৈরাচার, কখনো গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরাচার আবার কখনোবা দলীয় স্বৈরাচারের অধীনে এ দেশ পরিচালিত হয়েছে। যার ফলে কখনো সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থা এখানে গড়ে না উঠায় অার্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কিছুটা এগোলেও কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছেনি বাংলাদেশ। আজ যুদ্ধ পরবর্তী ৪৬ বৎসর পরও আমাদের অবস্থান বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশের সারিতে। অথচ আমাদের পরে স্বাধীনতা লাভ করেও অনেক দেশ উন্নতির শিখরে অবস্থান করছে।
এখনো আমরা পুঁজিবাদী দেশগুলোর কাছে সাহায্য নামক ভিক্ষা আর গণতন্ত্রের জন্য হাহাকার করি। আমাদের মানুষগুলো না খেয়ে মারা যায়। খাদ্য বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হচ্ছে আমাদের অনেককে। স্বাধীনতার ৪৬ বৎসর পরও জাতির মাঝে কেন এত বিভক্তি?
এতসব প্রশ্নের একমাত্র উত্তর হলো-আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি সত্য, অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য কার্যকর কোনো ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে পারিনি। যার পশ্চাতে একমাত্র কারণ হলো দেশের শাসক-গোষ্ঠীর অবহেলা, অনৈক্য ও প্রতিহিংসার রাজনীতি। এবং ক্ষমতা দখল ও সম্পদ লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতা ,এ অবস্থায় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের সকল নাগরিকগণ দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করা। যখনই আমরা অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে দেশের সকল নাগরিক এক হয়ে কাজ করতে পারবো তখনই আসবে আমাদের জন্য নতুন এক স্বাধীনতা। যেখানে শুধু স্বাধীনতাই নয়, আমরা পাবো একটি অর্থবহ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।
কবি শামসুর রাহমান বলেছেন স্বাধীনতা আমার বাগানের ঘর, কোকিলের গান,বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা, যেমন ইচ্ছে লেখা আমার কবিতার খাতা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার পরের অবস্থা সম্পর্কে সাম্যবাদী কবিতায় লিখেছিলেন গাহি সাম্যের গান, যেখানে আসিয়া  এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান। যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান। গাহি সাম্যের গান। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আজ আমরাও বলব প্রাণ পেয়েছি বাঁচতে চাই আকাশ পেয়েছি উড়তে চাই, আজকে পৃথিবীর বুকে বাঁচতে এবং উড়তে হলে দরকার একটি স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতশীলতা, সামাজিক শৃংখলা ও সম্প্রীতি স্থাপনের মাধ্যমে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন।  সূত্রঃ অধ্যাপক মহসীন ভূঁইয়া

নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে দূধর্ষ ডাকাতি সংঘঠিত

২০১১-২০১৬ | বিবিসিজার্নাল.ডটকম'র কোনো সংবাদ বা ছবি অন্য কোথাও প্রকাশ করবেন না

Development by: webnewsdesign.com